আমলকী একাদশীর ব্রত মাহাত্ম্য

হরেকৃষ্ণ🙏পাঠক বন্ধুরা সবাইকে নমস্কার। আশা করি ঈশ্বরের কৃপায় সবাই ভালো আছেন। ফাল্গুন মাসের শুক্লাপক্ষীয়া একাদশীর নাম আমলকী একাদশী। আগামী ১০ ই মার্চ রোজ সোমবার আমাদের পালন করতে হবে এই অতি পবিত্র আমলকী একাদশী ব্রত।  একাদশী ব্রত পালন করে একাদশী মাহাত্ম্য পাঠ ও শ্রবণ করলে শ্রী হরির কৃপা লাভ ও সৌভাগ্যের অধিকারী হওয়া যায়। তাই বন্ধুরা আজ আমরা আপনাদের জানাবো অতি পবিত্র আমলকী একাদশী ব্রত মাহাত্ম্য, একাদশী পালনের ৩টি স্তর, একাদশীতে নিষিদ্ধ পঞ্চ রবিশস্য, পরের দিন পারণের সময়সূচী ও পারণের মন্ত্র।

amloki ekadoshi

বন্ধুরা, সঙ্কটজনক অবস্থা বা জন্মমৃত্যুর অশৌচ কালেও কখনো একাদশী ব্রত পরিত্যাগ করতে নেই। একাদশীতে শ্রাদ্ধ উপস্থিত হলে সেইদিন না করে দ্বাদশীতে শ্রাদ্ধ করা উচিত। শুধু বৈষ্ণবেরাই নয়, শিবের উপাসক, সূর্য-চন্দ্র-ইন্দ্রাদি যেকোন দেবোপাসক, সকলেরই কর্তব্য একাদশী ব্রত পালন করা।

আমলকী একাদশী ব্রত মাহাত্ম্য :

যুধিষ্ঠির বললেন-হে কৃষ্ণ! মহাফলদাতা বিজয়া একদশীর কথা শুনলাম। এখন ফাল্গুন মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী যে নামে বিখ্যাত তা বর্ণনা করুন।

শ্রীকৃষ্ণ বললেন-হে মহাভাগ যুধিষ্ঠির! মান্ধাতার প্রশ্নের উত্তরে মহাত্মা বশিষ্ঠ এই একদাশীর মহিমা কীর্তন করেছিলেন। আপনার কাছে এখন আমি সেই কথা বলছি।

এই একাদশীর নাম 'আমলকী'। একাদশী বিশেষভাবে মহিমান্বিত। বিষ্ণুলোক প্রদানকারী রূপে এই একাদশীর দিন আমলকী বৃক্ষের তলে রাত্রি জাগরণ করলে সহস্র গাভী দানের ফল লাভ হয়।

আরো পড়ুনঃ শ্রীকৃষ্ণের প্রণাম মন্ত্র ও অষ্টোত্তর শতনাম

হে পাণ্ডুনন্দন! পূর্বে ব্রহ্মার রাত্রিতে দৈনন্দিন প্রলয় উপস্থিত হলে স্থাবর জঙ্গমসহ দেবতা, অসুর ও রাক্ষস সবকিছুর বিনাশ হয়। তখন ভগবান সেই কারণসমুদ্রে অবস্থান করেন। তাঁর মুখপদ্ম থেকে চন্দ্রবর্ণের একবিন্দু জল ভূমিতে পড়ে। সেই জলবিন্দু থেকে একটি বিশাল আমলকী বৃক্ষ উৎপন্ন হয়। এই বৃক্ষের স্মরণ মাত্র গো-দানের ফল, দর্শনে তাহার দ্বিগুণ এবং এর ফলভক্ষণে তিনগুণ ফল লাভহয়। এই বৃক্ষে ব্রহ্মা, বিষ্ণু আর মহেশ্বর সর্বদা অবস্থান করেন। এর প্রতিটি শাখা-প্রশাখা ও পাতায় ঋষি, দেবতা, ও প্রজাপতিগণ বাস করেন। এই বৃক্ষকে সমস্ত বৃক্ষের আদি বলা হয় এবং তা পরম বৈষ্ণব রূপে বিখ্যাত। অতএব এই শ্রেষ্ঠ ব্রত সকলেরই পালনীয়। এখন এই ব্রতের একটি অদ্ভুত ইতিহাস আপনার কাছে বর্ণনা করছি।

প্রাচীনকালে 'বৈদিশ' নামে এক প্রসিদ্ধ নগর ছিল। এই নগরে 'চৈত্ররথ' নামে এক রাজা রাজত্ব করতেন। চন্দ্রবংশীয় পাশবিন্দুক রাজার পুত্ররূপে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি অত্যন্ত শক্তিমান ও ঐশ্বয্যশালী ছিলেন। শাস্ত্রজ্ঞানেও তিনি ছিলেন সুনিপুন। তার রাজ্যের সর্বত্রই মনোরম আনন্দপূর্ণ এক দিব্য পরিবেশ লক্ষ্য করা যেত।

প্রজারা ছিলেন বিষ্ণুভক্তিপরায়ণ। সকলেই একাদশী ব্রত পালন করতেন। তার রাজ্যে কোন অভাব অমঙ্গল ছিল না। এইভাবে প্রজাদের নিয়ে রাজা চৈত্ররথ সুখে দিনযাপন করতে থাকেন।

একসময় ফাল্গুনী শুক্লপক্ষের দ্বাদশীযুক্তা আমলকী একাদশী তিথি সমাগত হওয়ায় রাজ্যের সকলেই এই ব্রত পালনের সংকল্প করলেন। ঐদিন প্রাতঃ স্নানের পর প্রজাদের নিয়ে রাজা ভগবান শ্রীবিষ্ণুর মন্দিরে যান। সেখানে সুবাসিত জলপূর্ণ কলস, ছত্র, বস্ত্র, পাদুকা, পঞ্চরত্ন ইত্যাদি দিয়ে সাজিয়ে স্থাপন করেন। তারপর ধূপ-দীপ দিয়ে যত্ন সহকারে মুনি-ঋষিদের দ্বারা শ্রীপরশুরাম মূর্তি সমন্বিত আমলকীর পূজা করেন। 'হে পরশুরাম! হে রেণুকার সুখবর্ধক! হে ধাত্রি! হে পাপবিনাশিনী আমলকী! তোমাকে প্রণাম। আমার অর্ঘ্যজল গ্রহণ কর।' এইভাবে দিনে যথাবিধি পূজা স্তবস্তুতি নৃত্যগীত করে রাজা ভক্তিভরে সেই বিষ্ণুমন্দিরে রাত্রি জাগরণ করতে লাগলেন।

আরো পড়ুনঃ এই গরমে ডাবের পানির জাদুকরি গুনাগুন জেনে নিন

এমন সময় দৈবযোগে একটি ব্যাধ সেখানে উপস্থিত হয়। পূজার সামগ্রী সহ বহু ব্যক্তিকে একত্রে রাত্রি জাগরণ করতে দেখে সে কৌতূহলাক্রান্ত হল। সে ভাবল-এসব কি ব্যাপার? বিষ্ণু মন্দিরে প্রবেশ করে সে বসে পড়ল। কলসের উপরে স্থাপিত বিষ্ণুমূর্তি দর্শন করল। ভগবান বিষ্ণু এবং একাদশীর মাহাত্ম্যও সে মনোযোগ দিয়ে শুনল। সারাদিন ঐ ব্যাধ কিছুই আহার করেনি। এইভাবে ক্ষুধায় কাতর হয়ে সেখানে সে রাত্রি জাগরণ করল।

পরদিন প্রজাসহ রাজা নগরের দিকে যাত্রা করলেন। সেই ব্যাধও তার গৃহে ফিরে গেল। এরপর একসময় ব্যাধের মৃত্যু হল। একাদশীতে রাত্রি জাগরণ ব্রত প্রভাবে সেই ব্যাধ পরবর্তী জন্মে এক রাজ্যের অধীশ্বর রূপে নিযুক্ত হল।

জয়ন্তী নামে এক নগরী ছিল। সেখানে বিদুরথ নামে এক রাজা বাস করতেন। ঐ ব্যাধ বিদুরথ রাজার মহাবলী পুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করেন। তার নাম হয় বসুরথ। এক লক্ষ গ্রামের আধিপত্য তিনি লাভ করলেন। তিনি ছিলেন সূর্যের মতো তেজস্বী, চন্দ্রের মতো কান্তিমান ও পৃথিবীর মতো ক্ষমাশীল। বিভিন্ন সদ্‌গুণে ভূষিত বসুরথ পরম বিষ্ণুভক্তি পরায়ণ হন।

এই মহাদাতা রাজা একবার শিকার করতে গিয়ে পথ ভুলে যান। গভীর জঙ্গলের মধ্যে ক্ষুধায় পীড়িত হয়ে তিনি ক্লান্তিবশতঃ শুয়ে পড়েন। এমন সময় কতগুলি পর্বতনিবাসী ম্লেচ্ছ রাজার কাছে এসে নানাভাবে উৎপীড়ন করতে থাকে। রাজাকে তাদের শত্রু মনে করে তারা তাকে হত্যা করতে চেষ্টা করে। "পূর্বে এহ রাজা আমাদের পিতা-মাতা, পুত্র-পৌত্র সবাইকে মেরে ফেলেছে। আমাদের গৃহছাড়া করেছে।"-এইরকম বলতে বলতে ম্লেচ্ছরা রাজাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। তারা বিভিন্ন অস্ত্র-শস্ত্রে তাঁকে আঘাত করতে থাকে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় তাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। রাজার কোন ক্ষতিই তারা সাধন করতে পারেনি। তখন রাজার শরীর থেকে নানা অলঙ্কারে বিভূষিতা এক পরমা সুন্দরী স্ত্রী মূর্তি আবির্ভূতা হন। মহাশক্তিধারিনী ঐ নারী অল্প সময়ের মধ্যেই সকল পাপী ম্লেচ্ছকে নিধন করল। রাজার নিদ্রাভঙ্গ হল। এই ভয়ানক হত্যাকাণ্ড দেখে রাজা অত্যন্ত বিস্মিত হলেন।

আরো পড়ুনঃ যেভাবে নিতে হবে ডায়াবেটিক রোগীর পায়ের যত্ন

তিনি বলতে লাগলেন-আহা! আমার শত্রুদের হত্যা করে কে আমার প্রাণ রক্ষা করল, এমন কৃপালু কে আছে? আমি তার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এমন সময়ে দৈববাণী হল-ভগবান কেশব ব্যতীত শরণাগতকে রক্ষা করবার আর কে আছে? তিনিই শরণ।গত পালক। দৈববাণী শুনে তিনি ভক্তিযুক্ত চিত্তে গৃহে ফিরে এলেন। তারপর প্রজাসহ মহাসুখে ইন্দ্রের মতো নিষ্কণ্টক রাজ্য ভোগ করতে লাগলেন।

বশিষ্ঠ বললেন-হে রাজন! যে মানুষ এই পরম-উত্তম আমলকী একাদশী ব্রত পালন করেন তিনি নিঃসন্দেহে বিষ্ণুলোক প্রাপ্ত হন।

একাদশী ব্রতে নিষিদ্ধ পঞ্চ রবিশস্যঃ

১. ধান জাতীয়ঃ চাল, মুড়ি, চিড়া, শ্যামাচাল, সুজি, পায়েস, খিচুড়ি প্রভৃতি।

২. গম জাতীয়ঃ আটা, ময়দা, সুজি, হরলিক্স, মিষ্টি, রুটি, বিস্কুট প্রভৃতি।

৩. যব বা ভূট্টা জাতীয়ঃ ছাতু, খৈ, রুটি প্রভৃতি।

৪. ডাল জাতীয়ঃ মুগ, মাসকলাই, খেসারী, মসুর, ছোলা, বরবটি, শিম, মটরশুঁটি প্রভৃতি।

৫. তৈল জাতীয়ঃ সরিষা তৈল, সয়াবিন তৈল, তিল তৈল প্রভৃতি।

আরো পড়ুনঃ বিকাশের পিন নাম্বার ভুলে গেলে কিভাবে রিসেট করবেন

একাদশী ব্রত পালনের ৩টি স্তরঃ

১. নির্জলাঃ একাদশীর দিন সূর্যোদয় থেকে পরদিন পারণের পূর্ব পর্যন্ত কোনো কিছুই গ্রহণ না করে ব্রত পালন করা।

২. সজলাঃ শুধু জল পান করে ব্রত পালন করা।

৩. সফলাঃ ফলমূল গ্রহণ করে ব্রত পালন করা।

আরো পড়ুনঃ ৬ টি বাহারি স্বাদের আচারের রেসিপি

পারণের সময়সূচী :

১১ ই মার্চ রোজ মঙ্গলবার সকাল ৬.১১ মিনিট হতে ৮.৪৮ মিনিটের মধ্যে।

পারণ মন্ত্র :

একাদশ্যাং নিরাহারো ব্রতেনানেন কেশব।

প্রসীদ সুমুখ নাথ জ্ঞানদৃষ্টিপ্রদো ভাব।।

এই মন্ত্র পাঠ করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পারণ করতে হয়।

প্রিয় পাঠক বন্ধুরা, আশা করি আপনারা সবাই ভগবান শ্রী হরির কৃপা পেতে নিষ্ঠা ও ভক্তির সাথে  আমলকী একাদশী ব্রত পালন করবেন। ভগবানের কৃপায় সবাই সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন। সবাইকে ধন্যবাদ। রাধে রাধে 🙏



Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url